১৪-২৫ বছরের ছেলে-মেয়েদের জন্য স্বাস্থ্যকর ওজন বাড়ানোর সহজ ঘরোয়া উপায় জানুন এখনই

By Dr.Sorifa

Published On:

Follow Us
১৪-২৫ বছরের ছেলে-মেয়েদের জন্য স্বাস্থ্যকর ওজন বাড়ানোর সহজ ঘরোয়া উপায় জানুন এখনই | ১৪-২৫ বছরের ছেলে-মেয়েদের জন্য স্বাস্থ্যকর ওজন বাড়ানোর সহজ ঘরোয়া উপায় জানুন এখনই

স্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি কেন জরুরি?

এই যে আজকাল অনেকেই রোগা হয়ে যাচ্ছে, ওজন কমছে, এটা কিন্তু মোটেই ভালো কথা না। বিশেষ করে ১৪ থেকে ২৫ বছর বয়সের ছেলে-মেয়েদের, যাদের শরীর বাড়ছে, মন বাড়ছে, তাদের তো পুষ্টির দিকে সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। অনেকে ভাবো, রোগা থাকা বুঝি ভালো, স্টাইলিশ। আরে বাবা, স্বাস্থ্য না থাকলে স্টাইল দিয়ে কী হবে? কম ওজন মানে রোগ-ব্যাধির সঙ্গে লড়ার ক্ষমতা কম। একটুতেই হাঁপিয়ে যাওয়া, মেজাজ খারাপ হওয়া, মনোযোগের অভাব—এই সব সমস্যা কম ওজনের কারণেই হয়।

আর হ্যাঁ, একটা ভুল ধারণা আছে অনেকের। ভাবো বুঝি, বার্গার, চিপস, কোল্ড ড্রিঙ্কস খেলেই ওজন বাড়বে। আরে না বাবা, এগুলো খেলে শরীরে চর্বি বাড়বে, পেশি নয়। তাতে হিতে বিপরীত হবে। মোটা হবে ঠিকই, কিন্তু শরীর খারাপ হয়ে যাবে। হার্টের রোগ, সুগারের সমস্যা—এইসব ডেকে আনবে। আসল কথা হলো, ওজন বাড়াতে হবে কিন্তু তা পেশী বাড়িয়ে, চর্বি বাড়িয়ে নয়। আর এর জন্য দরকার ভালো খাওয়া-দাওয়া আর ব্যায়াম।

১. হজমশক্তি হলো আসল চাবিকাঠি: পেটের খেয়াল রাখুন

ওজন বাড়াতে চাও তো? সবার আগে পেটের দিকে নজর দাও। তুমি যত ভালো খাবারই খাও না কেন, যদি হজম না হয়, তাহলে সব বৃথা। পেটের ভেতরে কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যাদের আমরা বলি মাইক্রোবায়োম। এদের কাজই হলো খাবার হজম করানো আর পুষ্টি শোষণ করানো। এদের ব্যালেন্স বিগড়ে গেলে গ্যাস, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা হয়, আর পুষ্টি শরীরে লাগে না। তাই ওজন বাড়াতে গেলে আগে পেটকে সুস্থ রাখো।

পেটের বন্ধু: প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক

  • পান্তা ভাত: অবাক হলে বুঝি? গরমের দিনে যে পান্তা খাও, সেটাই হলো দারুণ প্রোবায়োটিক। রাতে ভাত ভিজিয়ে রাখলে তাতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়। এটা হজমশক্তি বাড়ায়, পেট ঠাণ্ডা রাখে, আর পুষ্টি শোষণ করতে সাহায্য করে।
  • টক দই: টক দই হলো পেটের জন্য ওষুধের মতো। এটা পেটের খারাপ ব্যাকটেরিয়া দূর করে, হজম সহজ করে, আর এতে প্রচুর প্রোটিনও আছে, যা ওজন বাড়াতে কাজে দেয়। মিষ্টি দই না খেয়ে টক দই খাও, নইলে চিনিতে সব পুষ্টি নষ্ট হয়ে যাবে।
  • আচার ও অন্যান্য গাঁজানো খাবার: এই যে আমাদের বাড়িতে বানানো আচার, লস্যি, কেফির—এগুলোও ভালো ব্যাকটেরিয়ার উৎস। নিয়মিত খেলে পেটের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

আর একটা জিনিস, প্রিবায়োটিক। এটা হলো এক ধরনের ফাইবার, যা ওই উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের খাবার। কলা, আপেল, ওটস, শিম, মটরশুঁটি—এগুলোতে প্রচুর প্রিবায়োটিক থাকে। এইগুলো খেলে হজমতন্ত্র শক্তিশালী হবে। মনে রাখবে, আগে পেট ঠিক, তারপর ওজন বাড়বে।

২. কী খাবে আর কী খাবে না: উচ্চ-ক্যালোরি ও পুষ্টিকর খাবার

ওজন বাড়াতে গেলে শুধু ক্যালোরি বাড়ালে হবে না, পুষ্টিও বাড়াতে হবে। এমন খাবার খাও যাতে প্রোটিন, ফ্যাট আর কার্বোহাইড্রেট সব একসাথে থাকে।

প্রোটিন: পেশী তৈরির মাল-মশলা

  • ডিম: ডিম হলো সবথেকে ভালো প্রোটিনের উৎস। রোজ ২-৩টা ডিম খেতেই পারো। এটাতে সব জরুরি প্রোটিন থাকে।
  • মাছ, মাংস ও পনীর: মুরগির মাংস (বুকের মাংস), মাছ (বিশেষ করে সামুদ্রিক), আর পনীর—এগুলো থেকে ভালো প্রোটিন পাওয়া যায়।
  • ডাল, সয়াবিন ও বাদাম: যারা নিরামিষ খাও, তারা ডাল, সয়াবিন, পনীর আর বাদাম খেতে পারো। এগুলোতেও প্রচুর প্রোটিন আছে।

স্বাস্থ্যকর চর্বি: এনার্জির পাওয়ার হাউস

  • ঘি ও মাখন: গরম ভাতে এক চামচ দেশি ঘি বা মাখন মেখে খেতে পারো। এতে ক্যালোরি বাড়বে আর হজমও হবে।
  • বাদাম ও বীজ: কাজু, আখরোট, চিনাবাদাম, চিয়া বীজ, সূর্যমুখী বীজ—এগুলো হলো ক্যালোরি, প্রোটিন আর ভালো ফ্যাটের দারুণ উৎস।
  • তেল: এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল রান্নায় বা সালাদে ব্যবহার করতে পারো।

জটিল শর্করা: শক্তি দেবে সারাদিন

  • ভাত ও আলু: বাঙালিদের প্রধান খাদ্য হলো ভাত। ভাতের মাড় বা বসা ভাত খেলেও ক্যালোরি বাড়ে। আর আলু আর মিষ্টি আলু হলো কার্বোহাইড্রেটের দারুণ উৎস।
  • অন্যান্য শস্য: ওটস, আটার রুটি আর হোল-গ্রেইন পাস্তাও খেতে পারো। এগুলো দীর্ঘক্ষণ শক্তি দেয়।

৩. একটা রুটিন: ওজন বাড়ানোর নমুনা খাদ্যতালিকা

আরে বাবা, শুধু শুনলে হবে নাকি? একটা রুটিন দরকার। সারাদিন অল্প অল্প করে ৫-৬ বার খাও। নিচে একটা নমুনা দিয়ে দিলাম। এটা দেখে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারো।

সময়নমুনা খাদ্যতালিকা
সকাল (৮-৯টা)দুটো ডিমের অমলেট, সবজি দিয়ে রুটি, এক বাটি পান্তা ভাত, বা ওটস আর দুধ।
দুপুর (১-২টা)ভাত, ডাল, মাছের ঝোল বা মুরগির মাংস আর সবজি। বাঙালি খাবারই কিন্তু ওজন বাড়াতে দারুণ কাজে দেয়।
বিকেল (৫-৬টা)বাদাম, কিশমিশ, ফলের রস বা স্মুদি, ছোলার চাট বা দই দিয়ে ফল।
রাত (৮-৯টা)রুটি, সবজি, পনীর বা মুরগির মাংস। রাতে হালকা খাওয়াই ভালো।
ঘুমোতে যাওয়ার আগেএক গ্লাস দুধের সাথে খেজুর বা কিশমিশ।

Export to Sheets

আমাদের বাঙালি মশলাগুলোও কিন্তু দারুণ উপকারী

আদা, জিরা, হলুদ, পাঁচ ফোড়ন—এগুলো শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, হজমশক্তিও বাড়ায়। এগুলো খেলে খাবার ভালো হজম হয় আর খিদেও বাড়ে।

৪. লাইফস্টাইল ঠিক করুন: শুধু খেলেই হবে না

  • মন দিয়ে খান: খাবার খাওয়ার সময় টিভি দেখা বা মোবাইল ঘাটবেন না। ধীরে ধীরে চিবিয়ে খান। এতে হজম ভালো হবে।
  • ব্যায়াম: শুধু খেলে তো চলবে না, ব্যায়ামও করতে হবে। কার্ডিও নয়, পেশী তৈরির ব্যায়াম (যেমন পুশ-আপ, স্কোয়াট, প্ল্যাঙ্ক) করুন। এতে পেশী তৈরি হবে, আর খিদেও বাড়বে।
  • পর্যাপ্ত ঘুম: দিনে অন্তত ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমাতেই হবে। রাতে যখন আমরা ঘুমাই, তখনই শরীর পেশী মেরামত করে আর বাড়ায়। ঘুম কম হলে স্ট্রেস বাড়ে, যা ওজন বাড়াতে দেয় না।

৫. কিছু খাবার একেবারেই বাদ দিন:

  • ফাস্ট ফুড ও প্যাকেটজাত খাবার: পিৎজা, বার্গার, চিপস, বিস্কিট—এগুলো খেলে শরীরে শুধু চর্বি জমা হয়, কোনো পুষ্টি পাওয়া যায় না।
  • বেশি চিনি ও ভাজা জিনিস: মিষ্টি পানীয়, সিঙ্গারা, চপ—এগুলো হজম করা কঠিন আর স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ।
  • খাওয়ার আগে জল খাওয়া: খাওয়ার ঠিক আগে বা বেশি জল খেলে পেট ভরে যায়, আর প্রধান খাবার খাওয়া যায় না।

শেষ কথা: ডাক্তারের পরামর্শ নিন

এইসব টিপস তো দিলাম। কিন্তু যদি দেখো তোমার ওজন খুব কম (BMI ১৮.৫-এর নিচে) অথবা কোনো শারীরিক সমস্যা আছে, তাহলে নিজে নিজে কিছু করার আগে অবশ্যই একজন ভালো ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নাও। তারা তোমার জন্য একটা নির্দিষ্ট প্ল্যান তৈরি করে দেবেন। আর হ্যাঁ, কোনো মোটা হওয়ার ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খেও না। নিজের শরীরের খেয়াল রাখো, সুস্থ থাকো।

তথ্যসূত্র:

  1. World Health Organization – Healthy Diet
  2. National Institutes of Health – Nutrition for Teens

আমি ডাক্তার (MBBS, Cal) হিসেবে সাধারণ চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি। জ্বর, সর্দি-কাশি, পেটের সমস্যা, অ্যালার্জি, মাথাব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্ট ও রুটিন চেকআপের মতো সব ধরনের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসা করি। আমার লক্ষ্য হলো ধৈর্য্য ও স্পষ্টভাবে আপনার সমস্যা বোঝা এবং সহজ ভাষায় সঠিক চিকিৎসা দেওয়া। শিশু থেকে বয়স্ক—সবাইকে সেবা দেই।