বাংলাদেশী সিনেমার আকাশ থেকে খসে পড়া উজ্জ্বল নক্ষত্র: জাহানারা ভূঁইয়া
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের আকাশ থেকে আরেকটি নক্ষত্র খসে পড়ল। সত্তর–আশির দশকে সিনেমা হলে যিনি দর্শকদের হৃদয় কাঁপিয়েছিলেন, গান লিখে ছুঁয়ে গিয়েছিলেন লাখো মানুষের মন, অভিনয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এক স্বতন্ত্র নাম—তিনি জাহানারা ভূঁইয়া।
২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে মাত্র ৬৮ বছর বয়সে এই শিল্পী চিরবিদায় নিলেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শুধু প্রবাসী বাঙালিরাই নয়, ঢাকার সিনেমাপাড়া থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দর্শকরাও শোকাহত হয়ে পড়েছেন। অনেকে বলছেন—এ যেন এক যুগের সমাপ্তি।
শৈশবের অচেনা পাতা, তবুও শিল্পের টান
জাহানারা ভূঁইয়ার শৈশব নিয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। হয়তো তিনি চাইতেন না আলোচনায় আসুক তাঁর ব্যক্তিগত গল্পগুলো। তবে জানা যায়, তিনি জন্মেছিলেন এক সম্মানীয় পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই গান, সাহিত্য আর নাটকের প্রতি টান ছিল প্রবল।
স্বাধীনতার পরের সময়টা ছিল কঠিন—বিশেষ করে নারীদের জন্য। তবুও তিনি সাহস নিয়ে পা রেখেছিলেন শিল্পের পথে। সেই পথ ছিল সহজ নয়, কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল পরিষ্কার: শিল্পই হবে তার শ্বাস–প্রশ্বাস।
গানের কলমে শুরু, সিনেমার আলোয় উজ্জ্বলতা
অনেকে হয়তো জানেন না, তিনি প্রথমে ছিলেন গীতিকার। মুক্তিযোদ্ধা স্বামী সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার পরিচালনায় ‘নিমাই সন্ন্যাসী’ ছবির জন্য তিনি লিখেছিলেন গান। তার লেখা গানের কথায় ছিল এক ধরনের নির্মল আবেগ, যা শ্রোতাদের মনে দাগ কেটে যায়।
ভাবুন তো, যে নারীকে আমরা পরে সিনেমার পর্দায় দেখেছি, তিনি আসলে প্রথমে ছিলেন শব্দের কারিগর! এটি প্রমাণ করে তিনি কেবল অভিনেত্রী ছিলেন না, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন।
অভিনয়ের পর্দায় প্রথম আলো
আশির দশকে এসে অভিনয়ের জগতে পা রাখেন জাহানারা ভূঁইয়া। তার প্রথম আলোচিত কাজ ‘সৎ মা’ ছবির মাধ্যমে। সিনেমাটি মুক্তির পর দর্শকরা এক নতুন মুখ চিনে নিলেন, যিনি পর্দায় একেবারে প্রাকৃতিক ভঙ্গিতে চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
দর্শকরা হল থেকে বেরিয়ে গিয়েও তার অভিনয়ের কথা মনে রেখেছেন। কারণ, তিনি শুধু সংলাপ বলতেন না, চরিত্রের প্রাণ হয়ে উঠতেন। তার মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা, আর সংলাপের টান এমন ছিল যেন চরিত্রটি বাস্তবেই আমাদের চারপাশে বেঁচে আছে।
সমাজ আর নারীর গল্পে এক অগ্রদূত
জাহানারা ভূঁইয়া অভিনয়ে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি নিজেই নির্মাতা ও প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার প্রযোজিত ছবিগুলোতে সমাজের গল্প, বিশেষ করে নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবতা ফুটে উঠত।
তখনকার সময়ে নারী প্রযোজক খুব কমই দেখা যেত। তাই তার উদ্যোগ ছিল যুগান্তকারী। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারী শুধু পর্দার চরিত্র নয়—নারী ক্যামেরার পেছনেও সমান দক্ষ হতে পারেন।
শিল্পের সঙ্গী সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া
জাহানারার ব্যক্তিজীবনও শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। তার স্বামী সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও চলচ্চিত্র পরিচালক। এই দম্পতির সম্পর্ক কেবল দাম্পত্য ভালোবাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা ছিলেন একে অপরের শিল্পসঙ্গীও।
জাহানারার লেখা গান আর সিরাজুলের পরিচালনা মিলিয়ে জন্ম নিয়েছিল বহু কালজয়ী সিনেমা। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তারা যেন হয়ে উঠেছিলেন শিল্পের দুটি ভিন্ন স্রোত, যা একত্রে মিলে গড়ে তুলেছিল অমর শিল্পধারা।
জীবনের শেষ অধ্যায়
কিন্তু সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তার দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে যায়। টানা ১৬ মাস তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন মিনেসোটার লেক রিজ কেয়ার সেন্টারে।
প্রতিসপ্তাহে তিনদিন নিয়মিত ডায়ালাইসিস চললেও কোনো উন্নতি হয়নি। অবশেষে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার মৃত্যু শুধু একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; এটি এক যুগ, এক শিল্পধারা, এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান।
শোকের আবহে চলচ্চিত্র জগত
তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেমে আসে শোকের স্রোত। সহকর্মী অভিনেতা–অভিনেত্রীরা, পরিচালকরা এবং প্রবাসী বাঙালিরা স্মৃতিচারণা করতে থাকেন।
কেউ লিখেছেন—“জাহানারা ভূঁইয়া মানে এক পুরো প্রজন্মের আবেগ।”
আবার কেউ বলেছেন—“তার চলে যাওয়া মানে সিনেমার আকাশ থেকে আরেকটি তারা নিভে যাওয়া।”
অমর হয়ে থাকবেন তার সৃষ্টিতে
যারা তাকে দেখেছেন, তারা জানেন—তার প্রতিটি কাজের ভেতরে ছিল জীবন থেকে নেওয়া গল্প। স্বাধীনতার পর যখন বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের খুঁজছিল, তখন জাহানারা ভূঁইয়া সিনেমায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাদের সুখ, দুঃখ আর স্বপ্ন।
তার লেখা গান আজও গুনগুন করে গায় অনেকে। তার অভিনীত চরিত্র আজও আলোচনায় আসে। তার প্রযোজিত ছবিগুলোয় আজও খুঁজে পাওয়া যায় সমাজের আয়না।
তিনি হয়তো শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তার সৃষ্টি তাকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
একটি জীবনের পাঠশালা
জাহানারা ভূঁইয়ার জীবন আমাদের শেখায়—প্রতিভা থাকলে, পরিশ্রম করলে এবং স্বপ্ন আঁকড়ে ধরলে অসম্ভব কিছু নেই।
তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক যোদ্ধা, যিনি সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে নিজের পথ তৈরি করেছিলেন।
তার জীবন যেন এক পাঠশালা, যেখানে লেখা আছে—কীভাবে শিল্পের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে ইতিহাস রচনা করা যায়।
শেষকথা
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে জাহানারা ভূঁইয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি শুধু একটি নাম নন, তিনি একটি যুগ।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তার গাওয়া গান, লেখা কথা, অভিনীত চরিত্র আর প্রযোজিত সিনেমা চিরকালই মনে করিয়ে দেবে—তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন।
বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের আকাশ থেকে এক নক্ষত্র খসে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার আলো এখনো আমাদের মনে ঝলমল করে জ্বলবে।
Hey, I’m Arafat Hossain! With 7 years of experience, I’m all about reviewing the coolest gadgets, from cutting-edge AI tech to the latest mobiles and laptops. My passion for new technology shines through in my detailed, honest reviews on opaui.com, helping you choose the best gear out there