এই কালো ফলটি ডায়াবেটিস ও ক্যান্সার থেকে বাঁচাবে – জানুন জামের রহস্যময় উপকারিতা!

By Dr.Sorifa

Published On:

Follow Us
জামের অবিশ্বাস্য গুপ্ত শক্তি আবিষ্কার করুন!

ভেষজ রত্ন

বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া আর চীনে হাজার হাজার বছর ধরে জাম শুধু খাবার নয়, ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদিক, ইউনানি এবং চৈনিক চিকিৎসাপদ্ধতিতে জামের ফল, বীজ, পাতা, এমনকি গাছের বাকল পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়।

ফিলিপাইনে “ডুহাট” নামে পরিচিত এই ফল দিয়ে ডায়াবেটিস, হজমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি মাড়ির প্রদাহও সারানো হয়। এতো গুণ একটি ছোট্ট ফলে!

পুষ্টির ভাণ্ডার যা আপনাকে চমকে দেবে

প্রতি ১০০ গ্রাম জামের পুষ্টিগত উপাদান

পুষ্টি উপাদানপরিমাণদৈনিক মানের %
শক্তি৬২ কিলোক্যালোরি
কার্বোহাইড্রেট১৫.৫ গ্রাম
ফাইবার১.৫ গ্রাম
প্রোটিন০.৭২ গ্রাম
ফ্যাট০.২৩ গ্রাম
ভিটামিন সি১৪.৩-১৮ মিলিগ্রাম৮০%
আয়রন১.৪১ মিলিগ্রাম১%
ক্যালসিয়াম১৯ মিলিগ্রাম২%
পটাশিয়াম৫৫-৭৯ মিলিগ্রাম২%
ম্যাগনেসিয়াম১৫ মিলিগ্রাম৪%
ফসফরাস১৭ মিলিগ্রাম২%
সোডিয়াম১৪ মিলিগ্রাম১%

এছাড়াও আছে ম্যালিক অ্যাসিড, গ্যালিক অ্যাসিড, পলিফেনল এবং অ্যান্থোসায়ানিন। এই সব নামগুলো শুনতে জটিল লাগলেও, এদের কাজ কিন্তু অসাধারণ!

ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে জামের জাদুকরী শক্তি

জামের সবচেয়ে বিখ্যাত উপকারিতা হলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ। জামে আছে জাম্বোসিন (jambosine) এবং অ্যান্টিমেলিন (antimelin) নামের দুটি বিশেষ যৌগ। এরা রক্তের চিনির মাত্রা কমিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম খেলে ৬.৫% মানুষের ডায়াবেটিস কমে গেছে। জামের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম, তাই রক্তে চিনির মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় না।

আরও মজার বিষয় হলো জামের বীজ। এই বীজ শুকিয়ে গুঁড়ো করে খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক চা চামচ জামের বীজের গুঁড়ো এক গ্লাস পানিতে মিশিয়ে খান।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রকৃতির যোদ্ধা

জামে থাকা পলিফেনল আর অ্যান্থোসায়ানিন ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে। বিশেষ করে মুখ, জরায়ু, ডিম্বাশয় এবং মলদ্বারের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে জাম লড়াই করে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জাম খেলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। এটি ইস্ট্রোজেন-সংশ্লিষ্ট টিউমারের বৃদ্ধি বিলম্বিত করে।

হাতিশুর কি সত্যিই নিরাপদ? লোকজ বিশ্বাসের আড়ালে লিভার–কিডনিতে ক্ষতির সম্ভাবনা, বলছে বিজ্ঞান

হার্ট ও হজমশক্তির সেরা বন্ধু

জামে প্রচুর পটাশিয়াম আছে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখে।

হজমের জন্য জামের ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। জামের অ্যাস্ট্রিঞ্জেন্ট বৈশিষ্ট্য বদহজম, গ্যাস, পেট ফাঁপা এবং আলসারের সমস্যা সারায়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় জাদুর মতো

জামের ভিটামিন সি আর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণ সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।

ওজন কমাতে চান? জামে ক্যালোরি কম, ফাইবার বেশি। তাড়াতাড়ি পেট ভরে যায়, কিন্তু মোটা হওয়ার ভয় নেই।

সৌন্দর্যের জন্য জামের গোপন রহস্য

শুধু খেতেই নয়, জাম লাগালেও উপকার পাবেন! জামে থাকা ভিটামিন এ, বি, সি ত্বককে তরুণ রাখে। তৈলাক্ত ত্বক আর ব্রণের সমস্যা দূর করে।

জামের বীজের গুঁড়ো আর বেসনের মিশ্রণ দিয়ে ফেসপ্যাক বানান। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য দারুণ কাজ করবে।

চুলের যত্নেও জাম অসাধারণ। জামের বীজের গুঁড়ো চুলের মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করলে চুল পড়া কমে, খুশকি দূর হয়।

জামের উপকারিতা

জামের পাতা ও বাকলের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা

জাম গাছের পাতা সিদ্ধ করে সেই পানি দিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করলে দ্রুত ভালো হয়। জাম গাছের বাকল পিষে মাউথওয়াশ বানালে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়।

এমনকি পানি পরিশোধনেও জাম গাছের ডাল ব্যবহার হয়। পানির ট্যাঙ্কে জাম গাছের ডাল রাখলে পানি দীর্ঘদিন পরিষ্কার থাকে।

সতর্কতা: জানা জরুরি

জামের এত উপকার থাকলেও কিছু বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে:

  • খালি পেটে জাম খাবেন না। গ্যাস্ট্রিক, বদহজম হতে পারে
  • জাম খাওয়ার পর দুধ, দই, পনির খাবেন না
  • বেশি জাম খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে
  • কিডনিতে পাথরের সমস্যা থাকলে সাবধান
  • গর্ভবতী মায়েরা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খান

শেষ কথা

জাম শুধু একটি ফল নয়, এটি প্রকৃতির দেওয়া এক অমূল্য ওষুধ। ডায়াবেটিস থেকে ক্যান্সার, হার্টের সমস্যা থেকে সৌন্দর্য বৃদ্ধি – সব ক্ষেত্রেই জামের জুড়ি নেই।

তবে মনে রাখবেন, যেকোনো ভেষজ ওষুধ ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে।

এই গ্রীষ্মে বাজারে জাম দেখলে ভুলে যাবেন না এর অসাধারণ উপকারিতার কথা। একটু জাম, অনেক স্বাস্থ্য!

এই লেখাটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি কোনো চিকিৎসা পরামর্শ নয় এবং আপনার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানের জন্য যথাযথ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

তথ্যসূত্র

আমি ডাক্তার (MBBS, Cal) হিসেবে সাধারণ চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি। জ্বর, সর্দি-কাশি, পেটের সমস্যা, অ্যালার্জি, মাথাব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্ট ও রুটিন চেকআপের মতো সব ধরনের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসা করি। আমার লক্ষ্য হলো ধৈর্য্য ও স্পষ্টভাবে আপনার সমস্যা বোঝা এবং সহজ ভাষায় সঠিক চিকিৎসা দেওয়া। শিশু থেকে বয়স্ক—সবাইকে সেবা দেই।